ইসলামিক

পিতা-মাতার বিবাহ

পিতা-মাতার বিবাহ

হযরত আবু সালেহ মুসা নিতান্ত বাধ্য ও অনুগত ভাবে যুদীগ বার বার কাল সৈয়দ আবদুল্লাহ সাউফেয়ীর গৃহে অবস্থান করিয়া মুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করলেন। তিনি তাঁহাকে অতি যত্নের সহিত ইলমে তাসাউফ শিক্ষা প্রদান করিয়া মারেফাত তত্ত্বের অতি উচ্চ শিখরে আগ্লোহণ কইলেন।

নির্দিষ্ট সময়ে সৈয়দ আবু সালেহ মুসা পুনরায় সৈয়দ আবদুল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন ও বিদায় চাহিলেন। তখন বৃদ্ধ তাপস তাঁহাকে বলিলেন- বার বসর পরে যে তােমাকে ক্ষমা করিবই এইপ প্ৰতিশঠি আমি তোমাকে প্রদান করি নাই। আমি বলিয়াছিলাম যে, বার বার পরে আমি বিবেচনা করিয়া দেখিব তােমাকে ক্ষমা করা যায় কিনা। যাহা হউক, এখন যদি তুমি আমার আর একটি প্রস্তাবে রাজী ও তবে আমি তােমার অপরাধ ক্ষমা করিব। 

সৈয়দ আবু সালেহ পূর্বের মতই অত্যন্ত আগ্রহের সহিত চিন্তাসা করিলেন আপনার প্রস্তাবটি মেহেরবানী পূর্বক বলুন আমি নিশ্চয়ই তাহাতে রাজী হইব। 

তাপস প্রবর বলিলেন-আমার একটি কুণী, অন্ধ, বাবা ও খোঁড়া মেয়ে আছে। তুমি যদি তাহাকে বিবাহ করিয়া আমার কন্যার জামাতা হিসাবে আরও দুই, বসর আমার বাড়ীতে অবস্থান কর তবে তােমার অপরাধ ক্ষমা করিব ও তােমাকে চলিয়া। যাওয়ার অনুমতি প্রদান করিব। আমার মেয়েটি বিবাহযােগ্যা এবং আমারও বৃদ্ধকাল। মেয়েটির দায়িত্ব তােমার উপর অর্পণ করিতে পারিলে এবং একটি দৌহিত্রের মুখ দেখিবার সৌভাগ্য হইলে আমি শান্তিতে মরিতে পারি। বল আমার এই প্রস্তাবে তুমি রাজী আছ কিনা?

এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, সৈয়দ আবদুল্লাহ সাউমেয়ীর বাড়ীতে পদরি এতই কড়াকড়ি নিয়ম ছিল যে, সৈয়দ আবু সালেহ মুসা সুদীর্ঘ বার বসর তাঁহার বাড়ীতে অবস্থান করিলেও তাঁহার স্ত্রীকে বা কন্যাকে দেখিতে পান নাই।

সৈয়দ আবু সালেহ মুসা বৃদ্ধের এবারের প্রস্তাবে অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া পড়িলেন।

কারণ সংসারী হওয়ার ইচ্ছা তাঁহার মােটেও ছিল না। তিনি ইচ্ছা করিয়াছিলেন এখানে হইতে বিদায় লইয়া পুনরায় কোন একটা জঙ্গলে যাইয়া আশ্রয় লইবেন। কেননা, সংসারে তাঁহার আপন বলিতে কেহই ছিলনা পিতা-মাতা পূর্বেই দুনিয়া হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি চিন্তা করিতে লাগিলেন বিবাহ করিয়া সংসারী হইলে তাঁহার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটিবে। সেইজন্যই তিনি ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন কিন্তু তিনি যখন বুঝিতে পারিলেন যে, বৃদ্ধ তাপসের প্রস্তাবে রাজী না হইলে তাহা ক্ষমা পাওয়ার আশা নাই, তখন বাধ্য হইয়া তিনি রাজী হইলেন । 

যথা সময়ে সৈয়দ আবদুল্লাহ সাউমেয়ীর কন্যা উম্মুল খায়ের বিবি ফাতেমার সহিত সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গীর শুভ বিবাহ হইয়া গেল। 

বিবাহ অন্তে সৈয়দ আবু সালেহ বাসর ঘরে প্রবেশ করিয়া তথায় হুরপরী সদৃশ পরমা রূপবতী একজন যুবতী স্ত্রীলােক উপবিষ্টা দেখিয়া বিস্মিত, স্তম্ভিত ও ভীত হইয়া বাসর ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। এইরূপ অসামান্যা রূপবতী স্ত্রীলােক তাঁহার স্ত্রী হওয়ার কথা নহে তাঁহার স্ত্রী হইবে কালাে, কুণী, অন্ধ, বােবা ও ল্যাড়া। তিনি ধারণা করিলেন- সম্ভবতঃ অন্য কোন শ্ৰীলােক তাঁহার বাসর ঘরে যাইয়া বসিয়া রহিয়াছে এবং আমার স্ত্রী এখনও সেখানে যায় নাই। পরস্ত্রীর উপস্থিতি উপলব্ধি করিয়া তিনি তাহার সহিত কোনরূপ বাক্যালাপ করা তাে দূরের কথা, মুহূর্ত মাত্রও সেখানে বিলম্ব করিলেন না।

সৈয়দ আবদুল্লাহ তখন নিকটেই অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি জামাতাকে বাসর ঘর হইতে বাহির হইয়া আসার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন– সেখানে অপর একজন স্ত্রীলােককে উপবিষ্টা দেখিয়া আমি বাহির হইয়া আসিয়াছি–সস্তবতঃ আপনার কন্যা এখনও ওঘরে যায় নাই।

তিনি বলিলেন—বৎস! তুমি বাসর ঘরে যাহাকে দেখিয়া আসিয়াছ, সেই আমার একমাত্র কন্যা ও তােমার বিবাহিতা স্ত্রী। সৈয়দ আবু সালেহ বলিলেন—তবে আপনি যে বলিয়াছিলেন, আপনার কন্যা কুৎসিত, অন্ধ, বােবা ও ল্যাংড়া?

সৈয়দ আবদুল্লাহ বলিলেন—আমি তােমাকে যাহা বলিয়াছিলাম, তাহা অবশ্যই সত্য কথা, তবে উহার একটা গূঢ় অর্থ রহিয়াছে। কথাটা এইরূপ রহস্যপূর্ণ করিয়া বলার মাধ্যমে আমার উদ্দেশ্য ছিল তােমাকে পরীক্ষা করা। তাই বলিয়া আমি তােমাকে মিথ্যা কথা বলি নাই—যাহা বলিয়াছি, তাহার অর্থ তুমি বুঝিতে পার নাই। বৎস! আমি বলিয়াছিলাম যে, আমার মেয়ে অন্ধ, তাহার অর্থ এই যে, সে জীবনে কোন পরপুরুষের মুখ দর্শন করে নাই। সে বােবা, এই কথার অর্থ এই যে, সে তাহার পিতামাতা ব্যতীত অন্য কোন লােকের সহিত বাক্যালাপ করে নাই। সে জীবনে। কোনদিন আমার বাড়ীর বাহিরে যায় নাই, এই জন্যই আমি তাহাকে ল্যাংড়া বলিয়া উল্লেখ করিয়াছি। আর তাহাকে কেহ কোনদিন দর্শন করে নাই বলিয়া লােকের ধারণা ছিল যে, আমার মেয়েটি খুব কুৎসিত, সেইজন্য আমি তাহাকে কুৎসিত বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছি। এই সবই ছিল তােমার ঈমানের বল পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে।

এখন তুমি আল্লাহর দরবারে শােকরিয়া আদায় কর যে, আজ তুমি যাহাকে স্ত্রীরূপে লাভ করিলে, আমার সেই একমাত্র কন্যা ফাতেমা শুধু পরমা সুন্দরীই নহে পরমা গুণবতীও। সে নারীকুলের একটি অমূল্য রত্ন। সমগ্র জীলান নগরীতে তাহার মত সর্বতণ সম্পন্ন পরমা সুন্দরী, ধার্মিক ও বিদুষী রমণী তুমি আর দ্বিতীয়টি খুঁজিয়া পাইবে না । 

আজ আমিও আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শােকরিয়া আদায় করিতেছি যে, তােমার মত একজন চরিত্রবান, ধার্মিক ও পরহেজগার পাত্রের হাতে আমার একমাত্র স্নেহের ফাতেমাকে তুলিয়া দিতে পারিয়াছি। আমি অনেক দিন যাবৎ তােমার মত একটি সুপাত্রেরই সন্ধান করিতেছিলাম। আল্লাহ তাআলা আমার সেই আশা পূর্ণ করিয়াছেন।

এইকথা শুনিয়া সৈয়দ আবু সালেহ মুসা অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং আল্লাহর অশেষ শােকরিয়া আদায় করিলেন। বলা বাহুল্য যে, এই পরমা পুণ্যবতী ও ভাগ্যবতী মহিলাই আমাদের হযরত বড় পীর সাহেবের জননী উম্মুল খায়ের সৈয়দা ফাতেমা। এহেন পুণ্যবান পিতা ও পুণ্যবতী মাতার সন্তান আবদুল কাদের যে জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ওলী হইবেন, তাহাতে আর বিশ্বয়ের বিষয় কি আছে?

সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী কিশাের বয়সেই পিতামাতা হারাইয়া সংসার ত্যাগ করিয়া বনবাসী হইয়াছিলেন। সংসারে তাঁহার আপন বলিতে কেহই ছিল না, কাজেই বিবাহের পর তিনি শ্বশুরালয়েই রহিয়া গেলেন। সৈয়দ আবদুল্লাহর একমাত্র কন্যা ও স্ত্রী ব্যতীত দুনিয়ায় অন্য কেহই ছিল না। কাজেই তিনিও আবু সালেহ মূসাকে পুত্ররূপে লাভ করিয়া আল্লাহর অশেষ শােকরিয়া আদায় করিলেন।

ইহার কিছুকাল পরেই সৈয়দ আবদুল্লাহ ও তাঁহার স্ত্রী উভয়েই পরলােক গমন করিলেন এবং আবু সালেহ মুসা স্থায়ীভাবে সেই বাড়ীতেই বাস করিতে লাগিলেন। যেখানে সৈয়দ আবদুল্লার বাড়ী ছিল উহা ছিল জীলান নগরের উপকণ্ঠে অবস্থিত শহরতলী এবং উহাই বড় পীর সাহেবের জন্মভূমি।

বর্তমান ইরাক দেশের অন্তর্গত জীলান একটি বিখ্যাত শহর। অনেকে ইহাকে জীলান নগরীও বলিয়া থাকেন। হযরত বড় পীর সাহেবের পূর্বপুরুষ যে খাটি আরবের অধিবাসী ছিলেন, সেই সম্বন্ধে কাহারই কোন দ্বিমত নাই। তবে তাঁহারা কোন সময়, কি সূত্রে জীলানে আসিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহা জানা যায় না।

বিবাহের পর দীর্ঘকাল অতীত হইয়া গেল, কিন্তু উম্মুল খায়ের হযরত ফাতেমার গর্ভে কোন সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করিল না। এই জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যথেষ্ট মনােদুঃখে কাল যাপন করিতে লাগিলেন এবং একটি পুত্র সন্তানের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। এইভাবে বিবি ফাতেমার বয়স ষাট বসর উত্তীর্ণ হইয়া গেল, তখন তাঁহারা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সন্তানাদি লাভের আশা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করিলেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button